বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয় ২০২৫ - Zakat Rules
বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয় ২০২৫ - Zakat Rules ইসলাম ধর্মের প্রধান পাঁচটি স্তম্ভ কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত। এই পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। কিন্তু বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়, যাকাত শব্দের অর্থ কি, যাকাত কাকে বলে, যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত কয়টি, ১ লাখ টাকায় যাকাত কত, কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে, কোন কোন সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ ইত্যাদি আপনারা অনেকেই জানতে চান।
![]() |
বর্তমানে-কত-টাকা-থাকলে-যাকাত-ফরজ-হয় |
তাই আজকে বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়, যাকাত শব্দের অর্থ কি, যাকাত কাকে বলে, যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত কয়টি, ১ লাখ টাকায় যাকাত কত, কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে, কোন কোন সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ ইত্যাদি আপনাদের জানিয়ে দেবো ইনশাআল্লাহ।
বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়
যাকাত শুধুমাত্র আর্থিক ইবাদতই নয় বরং সামাজিক, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী মাধ্যম। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তিগণ তাদের সম্পদের একটি অংশ গরিব ও অসহায় মানুষের মধ্যে বন্টন করে, যা সমাজে সম্পদের সুষম বন্টন সুনিশ্চিত করে। চলুন আমরা বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিই।
বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়?
যাকাত ফরজ হওয়ার নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ আবশ্যক, যা ইসলামের পরিভাষায় নিসাব বলা হয়। আর যাকাতের নিসাব নির্ধারিত হয় স্বর্ণ, রোপ্য, ফসল, গবাদি পশু বা নগদ টাকার মূল্য অনুযায়ী। বর্তমানে ৯ লক্ষ টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয় (বর্তমানে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম হিসাবে ২০২৫ সাল)। ইসলামী শরীয়তে নিসাবের পরিমাণ নিম্নরূপ:
- স্বর্ণের নিসাব
- রোপ্যের নিসাব
- ফসলের নিসাব
- গবাদি পশুর নিসাব
- নগদ টাকার নিসাব
চলুন আমরা উপরের যাকাতের নিসাব অনুযায়ী বিস্তারিত জেনে নিই।
স্বর্ণের নিসাব
কারো ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ (৭.৫ তোলা স্বর্ণ) থাকলে তার ওপর যাকাত ফরজ। অর্থাৎ ৮৫ গ্রাম (৭.৫ তোলা) স্বর্ণ বা তার সমমূল্য থাকলে তাকে ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে এবং এটি বাধ্যতামূলক।
রোপ্যের নিসাব
৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য (৫২.৫ তোলা) বা তার সমমূল্য পরিমাণ নিসাব থাকলে ২.৫% হারে তাকে যাকাত দিতে হবে।
ফসলের নিসাব
বৃষ্টির পানিতে ফসল উৎপাদন করলে ১০% এবং সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করলে ৫% উসর বা যাকাত দিতে হবে।
গবাদি পশুর নিসাব
ভেড়া - ছাগল: ৪০ - ১২০ টি হলে একটি ভেড়া বা ছাগল যাকাত দিতে হবে।
গরু - মহিষ: ৩০ - ৩৯ টি হলে একটি এক বছরের বাছুর গরু - মহিষ যাকাত দিতে হবে।
নগদ টাকার নিসাব
স্বর্ণ বা রৌপ্যের নিসাব পরিমাণ সমমূল্যের সম্পদ থাকলে ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। সেই হিসেবে নগদ টাকা ৯ লক্ষ টাকা হলে ২.৫% হারে ২২,৫০০ টাকা যাকাত দিতে হবে। (২০২৫ সালে বর্তমানে এক ভরি স্বর্ণের দাম আনুমানিক ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা মূল্য ধরে)।
অর্থাৎ বর্তমানে কারো কাছে নগদ টাকা, সোনা, রুপা বা অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে ৯ লক্ষ টাকা বা তার বেশি পরিমাণ সম্পদ থাকলে এবং তা এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরজ হয়।
![]() |
বর্তমানে-কত-টাকা-থাকলে-যাকাত-ফরজ-হয় |
সুতরাং প্রিয় পাঠক, বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়, এর উত্তর হল ৯ লক্ষ টাকা এবং যাকাতের পরিমাণ হলো ২২ হাজার ৫০০ টাকা।
যাকাত শব্দের অর্থ কি
যাকাত (زكاة) আরবি শব্দ এর অর্থ হল পরিশুদ্ধকরণ, পবিত্র করা, বরকত হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। আরবি বছর দ্বিতীয় হিজরীতে অর্থাৎ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইসলামে যাকাতকে ফরজ বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যাকাত শুধুমাত্র শর্ত সাপেক্ষে সম্পদশালীদের জন্য ফরজ বা আবশ্যিক। পবিত্র কোরআন শরীফে নামাজের পর সবচেয়ে বেশি যাকাত শব্দটি ৩২ বার এসেছে। যাকাত হল সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ যা মহান আল্লাহ তাআলার নির্দেশে গরিব মিসকিনদের মধ্যে দান করা হয়। যাকাত প্রদান করার মাধ্যমে যাকাত দানকারীর আর্থিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করে সম্পদ পবিত্রতা অর্জন করে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করে।
যাকাত কাকে বলে
যাকাত (Zakat) হল ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সম্পদশালী মুসলিমদের ওপর একটি আর্থিক দান হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। অর্থাৎ ধনবান ব্যক্তি কর্তৃক নিজের ধন-সম্পত্তি থেকে ইসলামের রীতি-নীতি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট অংশ তথা ৪০ ভাগের এক ভাগ কোরআনে বর্ণিত নির্দিষ্ট খাতে প্রদান করাকে ইসলামে শরীয়তের দৃষ্টিতে যাকাত বলে। মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআন শরীফে বলেন, 'সালাত কায়েম করো এবং যাকাত দাও। আল্লাহর কাছে যা কিছু ধার করেছো, তা পূর্ণ করো'। (সূরা আল বাকারা: আয়াত নং ২৭৭)
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত কয়টি
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত ৫ টি এবং তা নিচে উল্লেখ করা:
১। যাকাত প্রদানকারীকে প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মুসলিম হতে হবে।
২। নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে।
৩। অর্জিত সম্পদ আরবি বা চন্দ্র এক বছর পূর্ণ হতে হবে।
৪। সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে যাকাত দাতার অধীনে থাকতে হবে।
৫। সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মিটিয়ে যে সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকতে হবে।
প্রিয় পাঠক আশা করি যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত কয়টি ও কি কি এ বিষয়ে বুঝতে এবং জানতে পেরেছেন।
১ লাখ টাকায় যাকাত কত
শুধুমাত্র ১ লাখ টাকায় কোন যাকাত প্রদান করতে হয় না। কেননা নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত গচ্ছিত না থাকলে সেই সম্পদের ওপর কোন যাকাত দিতে হয় না। কিন্তু গুচ্ছিত টাকার ওপর ২.৫% হারে যাকাত প্রদান করতে হয়। সেই হিসেবে এক লাখ টাকায় যাকাত হবে-
১,০০,০০০x২.৫% = ২,৫০০ টাকা।
১ লাখ টাকায় যাকাত কত? এই প্রশ্নের উত্তর হল ২,৫০০ টাকা।
কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে
কারো ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ (৭.৫ তোলা স্বর্ণ) থাকলে তার ওপর যাকাত ফরজ। অর্থাৎ ৮৫ গ্রাম (৭.৫ তোলা) স্বর্ণ বা তার সমমূল্য থাকলে তাকে ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে এবং এটি বাধ্যতামূলক। কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে? এর উত্তর হল ৭.৫ ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে।
কোন কোন সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ
সাধারণত সোনা, রুপা, কৃষিজাত ফসল, গবাদি পশু যেমন- ভেড়া, ছাগল, গরু, মহিষ এবং নগদ অর্থ (টাকা) এর ওপর যাকাত ফরজ।
![]() |
বর্তমানে-কত-টাকা-থাকলে-যাকাত-ফরজ-হয় |
যাকাত বন্টনের খাতসমূহ - (বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়)
পবিত্র আল-কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সুরা আত তাওবার ৬০ নাম্বার আয়াতে যাকাতের বন্টন নির্ধারণ করেছেন। এই খাত গুলো সরাসরি কোরআন দ্বারা নির্দিষ্ট এবং মহান আল্লাহতালার নির্দেশ। তাই এর বাইরে যাকাত বন্টন করলে তা ইসলামিক শরীয়ত সম্মত হবে না। নিচে যাকাত বন্টনের ৮ টি খাতসমূহ উল্লেখ করা হলো:
১। ফকির: যার জীবিকা নির্বাহ করার মত যথেষ্ট সম্পদ নেই।
২। মিসকিন: যার সামান্য সম্পদ রয়েছে, তবে দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন যাপন করছেন।
৩। যাকাত আদায়ের নিযুক্ত কর্মচারী: যাকাত সংগ্রহকারী কে বেতন দেওয়ার অনুমতি রয়েছে।
৪। ক্রীতদাস: যার মুক্তি পেতে টাকা প্রয়োজন।
৫। নওমুসলিম: যারা ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
৬। মুসাফির: যারা সফরে আছেন কিন্তু বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন।
৭। ধনী সম্পদশালী ব্যক্তি যার সম্পদের তুলনায় ঋণ বেশি: ঋণ পরিশোধের জন্য যাকাত গ্রহণ করতে পারেন।
৮। আল্লাহর পথে জিহাদরত ব্যক্তি: যারা আল্লাহর পথে শিক্ষা বা ধর্মীয় কাজের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন তাদের যাকাত প্রয়োজন।
এই আটটি হাতের মধ্যে যাকাত বিতরণ করা যেতে পারে যাতে সঠিকভাবে যাকাতের উদ্দেশ্য এবং ইসলামিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে হাদিস মতে এর পরিসর আরো প্রশস্ত।
আরো পড়ুন:
ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব
যাকাত শুধু একটি আর্থিক ইবাদতই নয় বরং এটি সামাজিক ন্যায় বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং হালাল হয়। যাকাতের গুরুত্ব বোঝাতে মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন, ' তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান কর। (সুরা বাকারা: আয়াত নং ১১০) যাকাত প্রদানের মাধ্যমে-
- অসহায় ও গরিব মানুষের সাহায্য করা হয়।
- সম্পদের সঠিক বন্টন সুনিশ্চিত হয়।
- ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে।
- সমাজের সম্পদ পুঞ্জিভূত হওয়ার প্রবণতা কম থাকে।
সর্বশেষ কথা - বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়
যাকাত ইসলামের একটি মৌলিক ফরজ বিধান এবং এটি সামর্থ্যবান মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক দায়িত্বের প্রতীক। যাকাতের মাধ্যমে আমরা সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি এবং অসহায় গরিব মানুষের সাহায্য করতে পারি। নিসাব পরিমাণ সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট সম্পদ গরিব মিসকীনদের মাঝে বন্টন করে দিতে হবে। আশা করি বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয় লেখাটি আপনাদের উপকারে আসবে। লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url