হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি - Hajj
হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি - Hajj "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা-লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক লা শারিকালাক" অর্থাৎ 'হে আল্লাহ! আমি হাজির! আমি উপস্থিত! আপনার ডাকে আমি সাড়া দিতে হাজির। আপনার কোন অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদাবলী আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য শুধুই আপনার। আপনার কোন অংশীদার নেই'।
![]() |
হজ্জের-ফরজ-ও-ওয়াজিব-কয়টি। ছবি - সংগৃহীত |
হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি ও কি কি আমরা অনেকেই জানিনা। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ - কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত এর মধ্যে অন্যতম হলো হজ। হজ আল্লাহর ফরজ বিধান। আর্থিক ও দৈহিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। জীবনের সকল গুনাহ মাফ এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো হজ। হাদিসে হজের অসংখ্য সওয়াব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি
'হজ' একটি আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো সংকল্প করা বা সফর করা। ইসলামের পরিভাষায় নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কার্যাবলী সম্পাদনের মাধ্যমে বায়তুল্লাহ শরীফ জিয়ারত করাকে হজ বলা হয়। হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি ও কি কি - চলুন এই বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জেনে নিই।
হজ্জের ফরজ কয়টি ও কি কি
পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, 'প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরজ'। (সূরা আল ইমরান: আয়াত নং ৯৭)
হজ্জের ফরজ ৩ (তিন) টি এবং তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
১। ইহরাম বাঁধা।
২। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা (উ'কুফে আ'রাফা)।
৩। তাওয়াফে জিয়ারত করা।
উপরে উল্লেখিত তিনটি ফরজ পালন না করলে হজ সহিহ হবে না। এবার আমরা হজ্জের ফরজ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিব।
১। ইহরাম বাঁধা
পবিত্র হজ বা ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে যখন গমন করা হয় তখন মিকাত অতিক্রম করার আগেই হজ প্রার্থীদের ইহরামের কাপড় পরতে হয়। ইহরামের কাপড় না পরে মিকাত অতিক্রম করা জায়েজ নয়। সেজন্য ইহরাম বাঁধা হজের অন্যতম একটি ফরজ কাজ এবং এটা অবশ্যই পালন করতে হবে।
২। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা (উ'কুফে আ'রাফা)
প্রত্যেক হজ প্রার্থীর আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের আরো একটি ফরজ কাজ। আরবি জিলহজ মাসের ৯ তারিখ জোহর থেকে শুরু করে ১০ জিলহজ ফজরের পূর্ব পর্যন্ত এর যে কোন সময় যদি আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন তাহলে ফরজ পালন করা হবে। এটা অবশ্যই পালন করতে হবে।
৩। তাওয়াফে জিয়ারত করা
প্রত্যেক হজ প্রার্থীকে আরবি জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ভোর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো সময়ে কা'বা ঘর তাওয়াফ বা সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হবে। এটা অবশ্য পালনীয় হজের শেষ ফরজ।
![]() |
হজ্জের-ফরজ-কয়টি। |
প্রিয় পাঠক উপরে উল্লেখিত হজের তিনটি ফরজ ইহরাম বাঁধা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ও তাওয়াফে জিয়ারত করা অবশ্যই পালন করতে হবে। যে কোন একটি ফরজ বাদ পড়লে বা অস্বীকার করলে তার হজ জায়েজ হবে না। তাই হজ পালন করার সময় হজের তিনটি ফরজ বিষয়ে খুবই সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। আশা করি হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে এবং জানতে পেরেছেন।
হজ্জের ওয়াজিব কয়টি ও কি কি
হজের ৩ টি ফরজ সম্পর্কে আমরা উপরের অংশে জানতে পেরেছি। এবার আমরা হজের ওয়াজিব কয়টি এবং কি কি সে সম্পর্কে জেনে নিব। হজ্জের ওয়াজিব ৬ (ছয়) টি এবং নিচে তা উল্লেখ করা হলো:
১। আরাফাত ময়দান থেকে মিনায় ফেরার পথে মুজদালিফা নামক স্থানে আরবি ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কিছু সময় অবস্থান করা। (সূরা বাকারা: আয়াত নং ১৯৮)
২। সাফা থেকে মারওয়ায় সাতটি দৌড় সম্পন্ন করতে হবে। এটিকে সায়ি বলা হয়। দৌড় শুরু হবে সাফা থেকে এবং শেষ হবে মারওয়ায়। (মুসলিম: হাদিস নং ২১৩৭)
৩। আরবি জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থিত ৩ টি জামরায় শয়তানকে ৪৯ টি পাথর মারতে হবে। (মুসলিম: হাদিস নং ২২৮৬)
৪। তামাত্তু ও কিরাণ (হজ তিন প্রকার। যথা: তামাত্তু, ইফরাদ ও কিরাণ) হাজকারীদের দমে শোকর বা হজের কোরবানি সম্পন্ন করতে হবে।
৫। হারাম শরীফের সীমানায় কোরবানির দিনগুলোতে ইহরাম ভঙ্গের উদ্দেশ্যে চুল ছোট করা বা মাথা মুন্ডণ করা। (বুখারী: হাদিস নং ১৬১৩)
৬। হজ্জের সকল কার্য সম্পাদন শেষে মিকাতের বাইরের বিদেশী হাজীগণের জন্য ১২ জিলহজ যেকোনো সময় তাওয়াফে সদর করা ওয়াজিব। মক্কার অধিবাসী ও হায়েজ-নেফাসধারী মহিলাদের জন্য এটা ওয়াজিব নয়। (মুসলিম: হাদিস নং ২৩৫০)
অবশ্য দূরবর্তী হজকারীদের জন্য মদিনা মুনাওয়ারায় রাসূল সাঃ এর রওজা মোবারক জিয়ারত করা ওয়াজিব। (আসান ফিকাহ: খন্ড - ০২; পৃষ্ঠা নং ২৫১)
প্রিয় পাঠক, হজের তিনটি ফরজ অবশ্য পালনের পাশাপাশি হজের ছয়টি ওয়াজিব অবশ্যই পালন করতে হবে। হজের ফরজ এবং ওয়াজিব সমূহ পালন না করলে বা অবহেলা করলে হজ জায়েজ বা সহীহ হবে না। এজন্য প্রত্যেক হজকারীকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ রইল। আশা করি হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে এবং জানতে পেরেছেন।
হজের সুন্নত কয়টি
ইসলামে হজ পালন করা খুবই মর্যাদা পূর্ণ এক ফরজ আমল। আবু হুরায়রা রাঃ বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, 'রাসূলুল্লাহ সাঃ কে জিজ্ঞাসা করা হলো - সর্বোত্তম আমল কোনটি? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা'। এরপর জিজ্ঞাসা করা হল - তারপর কোন আমল? তিনি উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদ করা'। আবার জিজ্ঞাসা করল হলো - এরপর কোন আমল? তিনি জবাবে বললেন, 'মাবরুর হজ (কবুল হজ্জ)'। (বুখারী: হাদিস নং ১৫১৯)
হজের অনেকগুলো সুন্নত রয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সুন্নত হলো:
- ইহরামের আগে উত্তমরূপে গোসল করা সুন্নত।
- তালবিয়াহ ("লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা-লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক লা শারিকালাক") পাঠ করা সুন্নত।
- পুরুষদের জন্য সাদা কাপড়ের ইহরাম বাঁধা সুন্নত।
- জিলহজ মাসের ৮ তারিখ দিবাগত রাতে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত।
- শয়তানকে কংকর বা পাথর নিক্ষেপ করার পরে দোয়া পাঠ করা সুন্নত।
- ইফরাদ ও কিরাণ হাজীদের (হজ তিন প্রকার। যথা: তামাত্তু, ইফরাদ ও কিরাণ) তাওয়াফে কুদুম করা হজের সুন্নত।
কোন কারণবশতঃ যদি উপরোক্ত হজের সুন্নত গুলো ছুটে যায় তাহলে এর জন্য কোন দম (কোন ওয়াজিব ছুটে গেলে সেটার জন্য পশু জবাই করে গরিব মিসকিনদের মাঝে দেওয়া) দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
![]() |
হজ্জের-ফরজ-ও-ওয়াজিব-কয়টি। |
ইসলামে হজের বিধান - (হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি)
পবিত্র হজ মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সেতুবন্ধনের অন্যতম একটি মাধ্যম। প্রতিটি শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্যবান নারী-পুরুষ এর ওপর পবিত্র হজ্জ পালন করা ফরজ। কেউ যদি হজ ফরজ হওয়ার পরও আদায় না করে সে বড় গুনাহগার হবে। আল্লাহর রাসূল সাঃ হাদিসে তাকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন।
পবিত্র হজ মহান আল্লাহ তায়ালার একটি ফরজ বিধান। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে বলেছেন, 'প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বাইতুল্লাহর হজ করা ফরজ'। (সূরা আল ইমরান: আয়াত নং ৯৭)
রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, 'হে লোকসকল! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর হজ ফরজ করেছেন'। আকরা ইবনে হাবিস রাঃ দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল সাঃ! এটা কি প্রত্যেক বছর ফরজ'? উত্তরে রাসূল সাঃ বললেন, 'আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তবে ফরজ হয়ে যেত। আর প্রতিবছর হজ ফরজ হলে তা তোমরা সম্পাদন করতে সক্ষম হতে না। হজ জীবনে একবারই ফরজ। কেউ যদি একাধিকবার করে, তবে তা নফল হজ হবে'। (বুখারী: হাদিস নং ৭২৮৮)
হজ পালন করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছে করেছে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা করে নেয়'। (সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ১৭৩২)
সুতরাং যাদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব তাদের হজ আদায় করা উত্তম। যেখানে মানুষের জীবন মরনের এক সেকেন্ডের কোন নিশ্চয়তা নেই। সেখানে এক বছর অনেক দীর্ঘ সময় ব্যাপার!
হজ ফরজ হওয়ার শর্ত - কার ওপর হজ ফরজ
প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। তবে পাঁচটি শর্তসাপেক্ষে হজের ফরজ বিধান রয়েছে। চলুন আমরা হজ ফরজ হওয়ার শর্ত বা কার কার ওপর হজ ফরজ সেই বিষয়ে জেনে নিই। হজ ফরজ হওয়ার শর্তগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১। মুসলিম হওয়া।
২। বিবেকবান হওয়া বা আকল থাকা অর্থাৎ পাগল না হওয়া।
৩। বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (অবশ্য এবছর সর্বনিম্ন বয়স ১৫ বছর)।
৪। আজাদ বা স্বাধীন হওয়া অর্থাৎ কারো গোলাম না হওয়া।
৫। দৈহিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া।
অবশ্য মহিলাদের ক্ষেত্রে আরও একটি শর্ত যুক্ত হবে আর সেটি হল - সঙ্গে মাহরাম (যেসব পুরুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ জায়েজ) থাকা।
হজের সম্পর্ক হল পবিত্র মক্কায় যাওয়া - আসার খরচের সঙ্গে। সুতরাং কেউ যদি স্থাবর সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে হজ আদায় করতে সক্ষম হয় এবং হজ থেকে ফিরে এসে বাকি সম্পত্তি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ। (ইমদাদুল আহকাম: ২/১৫২; আহসানুল ফতোয়া: ৪/৫১৬)
একইভাবে কোন ব্যবসায়ীর দোকানে যে পরিমাণ পণ্য সামগ্রী আছে, তার কিছু অংশ বিক্রি করে হজ আদায় করতে সক্ষম হয় এবং হজ থেকে ফিরে এসে বাকি পণ্য সামগ্রী দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা যায়, তাহলে তার ওপরও হজ ফরজ। (ইমদাদুল আহকাম: ২/১৫৩)
আরো পড়ুন
সর্বশেষ কথা - হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি
প্রিয় পাঠক উপরের আলোচনায় হজের ফরজ তিনটি এবং ওয়াজিব ছয়টি বিস্তারিত আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করি লেখাটি পড়ে আপনি উপকৃত হয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের হজের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি দান করুন এবং অক্ষম হজ প্রত্যাশীদের সক্ষমতা দান করুন। আমাদের সবাইকে হজ পালন করার শক্তি ও সামর্থ্য দান করুন - আমীন। হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url