লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস ও দোয়া জেনে নিন
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস ও দোয়া জেনে নিন laylatul qadr dua আরবি বারোটি মাসের মধ্যে সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ মাস হলো রমজান মাস। সিয়াম সাধনার মাস হল রমজান মাস। মহান আল্লাহ তা'আলা এই রমজান মাসের একটি রাতকে বিশেষ রাত ঘোষণা করেছেন ওই রাতের ইবাদত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।
![]() |
লাইলাতুল-কদর-সম্পর্কে-হাদিস-ও-দোয়া। ছবি-এআই |
বিশেষ এই রাতের নাম হলো 'লাইলাতুল কদর' বা 'শবে কদর'। লাইলাতুল কদর বা শবে কদর পরম করুনাময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'মিন বান্দাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার। এই রাত স্বল্প সময়ে অসংখ্য সওয়াব অর্জন করে নেওয়ার রাত। মহিমান্বিত এই রাতে সমগ্র মুসলিম জাতি মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সারারাত জেগে নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও তাসবীহ-তাহলিল করে অতীতের গুনাহ সমুহের জন্য মহান আল্লাহ তা'লার কাছে বিশেষ ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন।
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস ও দোয়া
পূন্যময় এ রাতে মহান আল্লাহর আদেশে ফেরেশতাগণ রহমত, কল্যাণ ও বরকত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এ রাতের নামে (সূরা কদর) একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন। এই রাতের ফজিলতের জন্য এটাই যথেষ্ট, অন্য কোন ফজিলত না থাকলেও এই রজনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস
পবিত্র লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে ইবাদতে মশগুল থাকা উত্তম। লাইলাতুল কদর সম্পর্কিত নিম্নের দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা উচিত। উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'হে রাসূলুল্লাহ সাঃ! আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর - তখন আমি কোন দোয়া পড়বো? তিনি (রাসুলুল্লাহ সঃ) বলেন, তুমি বলো-
আরবি উচ্চারণ:
اللَّهمَّ إنَّك عفُوٌّ تُحِبُّ العفْوَ، فاعْفُ عنِّي
বাংলা উচ্চারণ:
'আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্না'।
বাংলা অর্থ:
'হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন'। (তিরমিজি, হাদিস নং ৩৫১৩) এটি একটি লাইলাতুল কদর বা শবে কদর সম্পর্কে হাদিস।
আর এক হাদিস থেকে জানা যায়, আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, 'যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহ সমূহ মাফ করে দেওয়া হবে'। (বুখারী, হাদিস নং ২০১৪) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
![]() |
লাইলাতুল-কদর-সম্পর্কে-হাদিস-ও-দোয়া। ছবি-এআই |
লাইলাতুল কদর সম্পর্কিত আরো একটি হাদিস হতে জানা যায়, হযরত আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কদর রজনীকে রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতে অনুসন্ধান কর'। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৭, মুসলিম ১১৬৯, তিরমিজি ৭৯২)
ইবনে আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
নবী করিম সাঃ বলেছেন, 'তোমরা লাইলাতুল কদরকে রমজান মাসের শেষ দশকে সন্ধান করো। লাইলাতুল কদর হল নবম রাতে অর্থাৎ ২১ তম রাতে, বাকি দিন হল সপ্তম রাতে সেটা হল ২৩ তম রাত, আর অবশিষ্ট থাকলো পঞ্চম রাত আর তাহলো ২৫ তম রাত'। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২০২১; আবু দাউদ ১৩৮১) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসূলুল্লাহ সাঃ রমজান মাসের শেষ ১০ দিন এলে ইবাদতের জন্য জোর প্রস্তুতি নিতেন। রাত জেগে থাকতেন, নিজের পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন'। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০২৪; মুসলিম ১১৭৪) এটি একটি লাইলাতুল কদর বা শবে কদর সম্পর্কে হাদিস।
আবু সাঈদ আল খুদরী রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসুলুল্লাহ সাঃ রমজানের প্রথম দশ দিনে ইতিকাফ করেছেন। তারপর তিনি একটি তুর্কি ছোট তাঁবুতে ইতিকাফ করেছেন মধ্যের দশ দিন। অতঃপর তিনি তাঁর মাথা তাঁবুর বাইরে বের করে বলেছেন, আমি কদর রজনী সন্ধান করার জন্য প্রথম ১০ দিনে ইতিকাফ করেছি, তারপর মাঝের দশ দিনে করেছি, তারপর আমার কাছে তিনি মালাক (ফেরেশতা) এসেছেন। মালাক (ফেরেশতা) আমাকে বলেছে, লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ ১০ দিনে। অতএব, যে আমার সাথে ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন শেষ ১০ দিনে করে। আমাকে স্বপ্নে কদর রজনী নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছেন। তারপর তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ জিব্রাইল আঃ আমাকে বললেন, অমুক রাতে শবে কদর। তারপর তা কোন রাতে আমি ভুলে গেছি'। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০২৭; মুসলিম ১১৬৭) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
আবু বকর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসূলুল্লাহ সাঃ কে বলতে শুনেছি - তোমরা লাইলাতুল কদর কে রমজান মাসের অবশিষ্ট নবম রাতে অর্থাৎ ২৯ তম রাতে, অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে অর্থাৎ ২৭ তম রাতে অথবা অবশিষ্ট পঞ্চম রাতে অর্থাৎ ২৫ তম রাতে, অথবা অবশিষ্ট তৃতীয় রাতে অর্থাৎ ২৩ তম রাতে, অথবা শেষ রাতে খোঁজ করো'। (সহিহ তিরমিজি, হাদিস নং ৭৯৪) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
উবাদাহ ইবনুস সামিত রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসূলুল্লাহ সাঃ একবার আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের খবর দেবার জন্য মসজিদে নববীর হুজরা থেকে বের হলেন। এ সময় মুসলিমদের দুই ব্যক্তি ঝগড়া শুরু করলো। এ অবস্থা দেখে তিনি (রাসূল সাঃ) বললেন, আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে খবর দিতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তি ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হলো। ফলে লাইলাতুল কদরের খবর আমার মন হতে উঠিয়ে নেয়া হলো। বোধহয় ব্যাপারটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর হয়েছে। তাই তোমরা 'লাইলাতুল কদর' কে রমজানের ২৯, ২৭ কিংবা ২৫ এর রাতে খোঁজ করবে'। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০২৩; দারিমী ১৮২২) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বেশিরভাগ আলেম বলেছেন, '২৭তম রাতই লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি'। উবাই ইবনে ক্বাব রাঃ বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাদের যে রাতকে লাইলাতুল কদর হিসেবে কিয়ামুল লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা হল রমজানের ২৭তম রাত'। (মুসলিম, হাদিস নং ৭৬২) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
লাইলাতুল কদরের আলামত
এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, 'ওই রাতের সকালে সূর্য উদয় হবে কিন্তু এতে কিরণ বা আলো থাকবে না'। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৬২) এটি একটি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস।
![]() |
লাইলাতুল-কদর-সম্পর্কে-হাদিস-ও-দোয়া। ছবি-এআই |
আবু সাঈদ আল খুদরী রাঃ লাইলাতুল কদর রাতের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সে রাতে বৃষ্টি হয়েছিল মসজিদের ছাদ খেজুরের ডাল পাতার হওয়ায় ২১তম রাতের সকালে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর কপালে পানি ও মাটির চিহ্ন ছিল। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০২৭)
লাইলাতুল কদর রাতে জিকির ও দোয়া
পবিত্র রমজান মাসের মহিমান্বিত রাত হল লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। এই রাতে জিকির ও দোয়া পাঠ করলে মহান আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হন এবং খুশি হন। এই রাতে দুরুদ শরীফ ও ইস্তেগফার পাঠ মহান আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয়। এই রাতে বেশি বেশি দুরুদ ও ইস্তেগফার পাঠ করা যেতে পারে। হযরত আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাঃ! লাইলাতুল কদরের রাতে কোন দোয়াটি পাঠ করা উচিত? রাসূলুল্লাহ সাঃ তাকে নিম্নের দোয়াটি পাঠ করতে বললেন।
দোয়াটি হল:
'আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি'।
দোয়াটির অর্থ হলো:
'হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন'। ( তিরমিজি, হাদিস নং ৩৫১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ)
লাইলাতুল কদরের ফজিলত
পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অন্তর্নিহিত। সমস্ত মুসলিম জাতির জন্য লাইলাতুল কদরের রাত হল শ্রেষ্ঠ রাত। এই রাত অনেক তাৎপর্যপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ। মহিমান্বিত এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র আল-কোরআন নাজিল করেছেন। লাইলাতুল কদর নিয়ে মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআন শরীফে 'আল কদর' নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন।
এক হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায়, 'লাইলাতুল কদরের রাতে জিব্রাইল আঃ ও অন্যান্য ফেরেশতাগণ এর সাথে জমিনে নেমে আসেন এবং প্রত্যেক ওই বান্দার জন্য রহমত ও মাগফেরাতের দোয়া করেন, যে দাঁড়িয়ে, বসে আল্লাহর ইয়াদ ও ইবাদতে মশগুল থাকে'। (বায়হাকী)
আরো পড়ুন:
সর্বশেষ কথা - লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস ও দোয়া
পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর রয়েছে। মহিমান্বিত এই লাইলাতুল কদর রাতে সমস্ত মুসলিম জাতি মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সারা রাত জেগে নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির আজগার করে অতীতের গুনাহের জন্য মহান আল্লাহতালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। আমরা রমজান মাসের শেষ দশকে 'আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি' এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করবো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো। আশা করি আজকের লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url