সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত বর্ণনা

সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত বর্ণনা। আসসালামু আলাইকুম। Surah Kausar Bangla সূরা কাওসার পবিত্র আল কোরআনের সবচেয়ে ছোট এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সূরা। সূরা কাওসার পবিত্র আল কোরআন শরীফের ১০৮ তম সূরা এই সূরার মোট আয়াত সংখ্যা ৩ এবং রুকু সংখ্যা ১। সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত সম্পর্কে জানতে হলে আজকের লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ুুন।
সূরা-কাওসার-বাংলা-অর্থসহ
সূরা-কাওসার-বাংলা-অর্থসহ। ছবি - এআই
সূরা কাওসার এর অর্থ হচ্ছে 'প্রভূত কল্যাণ'। এই সূরার অপর নাম হল সূরা নাহার। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর নবী জীবনে মক্কায় অবস্থানকালে এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সূরা আল কাউসার মাক্কী সূরার অন্তর্ভুক্ত। এই সূরাটি ১০ টি শব্দ এবং ২৪ টি অক্ষর নিয়ে গঠিত। পবিত্র কোরআন শরীফের ক্রমানুসারে সূরা কাওসারের অবস্থান হল এর পূর্বে সূরা আল মাউন এবং পরের সূরাটি হলো সূরা কাফিরুন। সূরা কাওসার পবিত্র কোরআন শরীফের ৩০ তম পারায় অবস্থিত। চলুন, সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ

'কাওসার' শব্দটি পবিত্র কোরআনে শুধুমাত্র একবারই ব্যবহৃত হয়েছে। এই সূরার নামটি এর প্রথম আয়াত থেকে নেওয়া হয়েছে। এই সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাঃ কে বিরাট কল্যাণ ও সুসংবাদ দান করেছেন। নবী করিম সাঃ কে নামাজ আদায় ও কোরবানির আদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর মর্যাদাকে আরো সুসংগঠিত ও মহিমান্বিত করেছেন।

সূরা কাওসার আরবি উচ্চারণ: Surah Kausar

(بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِي)
১। إِنَّآ أَعْطَيْنَٰكَ ٱلْكَوْثَرَ
২। فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنْحَرْ
৩। إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلْأَبْتَرُ

সূরা কাওসার বাংলা উচ্চারণ - Surah Kausar Bangla

(বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম)
১। ইন্না আ'তাইনা কাল কাওসার।
২। ফাসালিল লিরাব্বিকা ওয়ানহার।
৩। ইন্না শানি'য়াকা হুওয়াল আবতার।

সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ অনুবাদ:

(পরম করুনাময় মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি)
১। নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওসার (প্রভূত কল্যাণ) দান করেছি।
২। অতএব আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।
৩। নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই লেজকাটা, নির্বংশ।
(সূরা কাওসার, আয়াত: ১-৩)

সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত

সূরা কাওসার পবিত্র কোরআন শরীফের সবচেয়ে ছোট সূরা হলেও এর ফজিলত এবং মাহাত্ম্য অনেক বেশি। সূরা আল কাওসার যেই মুহূর্তে নাযিল হয় সেই মুহূর্তে সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলুল্লাহ সাঃ এর চেহারা মোবারকে হাসির নূরানী ছটা দেখতে পান। সূরা কাওসার হল দোজাহানের অফুরন্ত কল্যাণের সুখবর প্রদানকৃত সূরা। সূরাটি নবী করিম এর ওপর মহান আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বলে। জান্নাতের অন্যতম নদী বা ঝর্ণা হলো আল কাওসার।
সূরা-কাওসার-বাংলা-অর্থসহ
সূরা-কাওসার-বাংলা-অর্থসহ। ছবি - এআই
আল কাওসার সম্পর্কে আব্দুল্লাহ বিন ওমর বলেন, আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেন,
'আল-কাওসার জান্নাতের একটি নদী। তার পাড় সোনার এবং তার গৌরব এলেম ও নীলকান্তমণির চেয়ে উত্তম, গন্ধ - কস্তুরীর চেয়ে ভালো ও এর পানি বরফের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি'।

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একদিন রাসূলুল্লাহ সাঃ মসজিদে আমাদের সামনে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ তাঁর মধ্যে তন্দ্রা বা এক ধরনের অবচেতনার ভাব দেখা গেল। অতঃপর তিনি হাসিমুখে মাথা উঠালেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাঃ! এর কারণ কি? তিনি বললেন, এই মুহূর্তে আমার নিকট একটি সূরা নাযিল হয়েছে। অতঃপর তিনি বিসমিল্লাহসহ সূরা আল কাওসার পাঠ করলেন। তারপর তিনি বললেন, তোমরা জানো - কাওসার কি?

আমরা বললাম, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলই এ বিষয়ে ভালো জানেন! তিনি বললেন, এটা জান্নাতের একটি নহর। আমার রব আমাকে এটা দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন। এতে অজস্র কল্যাণ রয়েছে এবং এই  হাউজে কাউসারে কেয়ামতের দিন আমার উম্মত পানি পান করতে যাবে। এই পানি পান করার পাত্র সংখ্যা আকাশের তারকা সমূহ হবে। তখন কতকগুলো লোককে ফেরেস্তারা হাউজ থেকে হটিয়ে দিবে। আমি বলব, হে আমার রব! সে তো আমার উম্মত। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে রাসুল! আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা নতুন পথ ও মত অবলম্বন করেছিল। (মুসলিম: ৪০০; মুসনাদে আহমাদ: ৩/১০২)

অন্য এক হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, 'ইসরা ও মেরাজের রাত্রিতে আমাকে এক প্রস্রবনের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। যার দুই তীর ছিল মুক্তার খালি গম্বুজে পরিপূর্ণ। আমি বললাম, জিব্রাইল আঃ এটা কি? তিনি বললেন, এটাই কাওসার'। (বুখারী: ৪৯৬৪)

এখানে জানা আবশ্যক যে, কাওসার ও হাউজ একই বস্তু নয়। হাউজের অবস্থান হবে হাশরের মাঠে, যার পানি কাওসার থেকে সরবরাহ করা হবে। আর কাওসারের অবস্থান হল জান্নাতে। হাশরের ময়দানের হাউজ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, জান্নাতের কাওসার ঝর্ণাধারা থেকে পানি এনে হাউজে ঢালা হবে। এক হাদীসে বলা হয়েছে, 'জান্নাত থেকে দুটি খাল কেটে এনে তাতে ফেলা হবে এবং এর সাহায্যে সেখান থেকে তাতে পানি সরবরাহ করা হবে'। (মুসলিম: ২৩০০; মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪২৪, ৫/১৫৯, ২৮০, ২৮১, ২৮২, ২৮৩)

সুতরাং কাওসারের মূল উৎস হল জান্নাতে। আর সেখান থেকেই রাসূলুল্লাহ সাঃ এর জন্য আরেকটি হাউজে পানি আসবে। হাশরের ময়দানে তিনি তাঁর প্রিয় উম্মতদের সেই হাউজ থেকে পানি পান করাবেন।

সূরা কাওসার এর শানে নুযুল - সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ

মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে হোসাইন থেকে বর্ণিত, তৎকালীন আরবে যে ব্যক্তির পুত্র সন্তান মারা যেত তাকে আবতার বা নির্বংশ বলা হতো। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর পুত্র কাসেম অথবা ইব্রাহিম শৈশবে মারা যাওয়ার পর কাফেররা তাঁকে নির্বংশ বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে উপহাস করত। তাদের মধ্যে আস ইবনে ওয়ায়েল এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার সামনে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর কোন বিষয়ে আলোচনা হলে সে বলতো, আরে তার কথা বাদ দাও। সে তো কোন চিন্তাই বিষয় নয়। কারণ সে নির্বংশ। তার মৃত্যু হয়ে গেলে তার নাম উচ্চারণ করারও কেউ থাকবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূল সাঃ কে সান্ত্বনা ও উপহার স্বরূপ সূরা আল কাওসার নাযিল করেন। (ইবনে কাসির, মাযহারি)
আরো পড়ুন:

সর্বশেষ কথা - সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত

মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদত করার জন্য। সূরা আল কাওসার এ আল্লাহর তাওহীদ তথা একত্ববাদের বাণী এসেছে। আল্লাহ তাআলার সঙ্গে অন্য কোন কিছুর শরীক না করার কথা পবিত্র কোরআনে বারবার এসেছে। সূরা কাওসারেও এ সম্পর্কিত নির্দেশ এসেছে। সূরা কাওসার আকারের ছোট হলেও এই সূরাটি প্রভূত কল্যাণকর সূরা। এই সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহতালা তাঁর প্রিয় রাসূল সাঃ কে জান্নাতের নহর দান করার কথা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। আর সেই কাওসারের পানি মহানবী সাঃ তাঁর উম্মতদের পান করানোর কথা উল্লেখ করেছেন। আশা করি আপনারা সূরা কাওসার বাংলা অর্থসহ ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এবং বুঝতে পেরেছেন। লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url